মধ্যবিত্তিক কনফিউশন (মধ্যবিত্তের ডায়েরী – ১)

Engineering পাশ করে বেরোনো টা আগে ছিল রীতিমত গর্বের ব্যাপার। কিন্তু যখন আমরা বেরচ্ছি সেই সময়ের মধ্যে পৃথিবী যেন বদলে গেল। ব্যাপারটা শুরু আগে থেকেই অবশ্য, প্রচুর কলেজ খুলল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে চাকরীর সুযোগ বাড়ল না তেমন ভাবে। আমরা ভাগ্যতাড়ীত কয়েকজন, আর আমি একটা চাকরী যোগারও করলাম নিজের জন্য, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না যে কাজের জন্য চাকরী পেয়েছি সেটা।

সৈকত ফোন করল একদিন, ভাই ব্যাঙ্গালোর যাবো ভাবছি চাকরী খুজতে যাবি নাকি?

– যেতে তো আপত্তি নেই, কিন্তু এদিকে যে কথা হয়ে আছে, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা কি ঠিক হবে?

– তুই ভেবে দেখ, আমার তো কিছু নেই, তো কোন অসুবিধাও নেই।

– একটু ভাবতে দে, দেখছি।

বাবাকে বললে কি বাবা যেতে দেবে? যদি না বলি, এখানে একটা চাকরী পেয়েছি, তাহলে নিশ্চয় আপত্তি করবে না। এখানে ভবিষ্যৎ বলে ত কিছু নেই, বাবারও তো চাকরী আছে কিছুদিন, রিস্ক নেয়াই যায়। কিন্তু দোনমনা করেই চলেছি, কোন সিদ্ধান্তে আস্তে পারছি না। একটা whiskey কিছুটা সাহায্য করবে।

আমরা তখন কসবা তে থাকতাম, বালীগঞ্জ স্টেশন থেকে কসবা পোস্টাপিসের দিকে হাঁটতে থাকলে ডান হাতে একটা বড় ভাঙ্গাচোড়া টাইপের বিল্ডিং ছিলো, LIC না কিসের যেন, তার পাশে দৈনিক লটারির কয়েকটা দোকান, আমার এক বন্ধু খেলত, জিতেওছে কয়েকবার, সুপার লোটো না কি যেন বলে, হ্যাঁ তো সেই দোকানের পাশে রাস্তার দুই পাশে দুটো মদের দোকান, সরকারী ছিল তখন সব, আমরা বলতাম কাউন্টার। সেইখানে লাইন দিতে যেতে হবে। এখনকার মত তখন এত সহজে মাল কিনতে থোড়াই পাওয়া যেত তখন? আর ছিল মধ্যবিত্তের ভয়, কেউ যদি দেখে ফেলে? আমরা তখন, মুদিখানার দোকানী থেকে রিক্সাওয়ালা, খবরের কাগজ দেয়া কাকু থেকে পোস্টাপিসের পিওন, সবাইকে ভয় পেতাম, একটা গরহিত অপরাধ করতে জাচ্ছি কিনা! ভাবতাম মাঝে মাঝে, টিভি তে এত কন্ডোম কেনার বিজ্ঞাপন দেয়, লজ্জা না করে কিনুন, মাল কেনার কেন দেয়না, লোককে শিক্ষিত এদিক থেকেও তো করা দরকার। আর এইসব কাউন্টারে ভীড়ও থাকত সব রিক্সাওয়ালাদের, ভয় পেতাম, মাল খেয়ে দুঘা যদি দিয়ে দেয়। তখন কিছু মল খুলেছে, বালিগঞ্জে পি.সি সরকারের বাড়ি, তার সামনে একটা মল খুলেছে, সেখানে জেতেও ভয়, জামাকাপড় ইস্তিরি করা নেই। শালা মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানই ভুল। কাউন্টার ই ঠিক আছে, ওই লাইনে আমিই বড়লোক।

দুপেগ ভিতরে যাবার পরে মানুষ কেমন extreme হয়ে যায়, কেউ আবেগপ্রবণ তো কেউ চূড়ান্ত ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ততা ধুয়ে মুছে খাক হয়ে যায়। আমি একটু ব্যবসায়ী হয়ে গেলুম হয়ত, ভালো কি মন্দ সময়ি বিচার করবে, অত ভেবে কি লাভ? সৈকত কে ফোন করতে হবে। আমাদের সময় মোবাইল এত সহজলভ্য বস্তু ছিলনা, মোবাইল থাকলেও বেশিরভাগ সময় ব্যালান্স থাকত না, মিসড কল ব্যাপারটাও বেশ জনপ্রিয় ছিল। সৈকত কে ফোন মিসড কল দিলে, ও ল্যান্ডলাইত থেকে কল করবে, বেশিরভাগ মানুষই ল্যান্ডলাইনটাই বেশী ব্যাবহার করত, সস্তা পরত। দুই তিন মিনিট পরেই সৈকতের ফোন এল, সব ঠিকঠাক করে নিলাম। আমাদের সঙ্গে খুড়ো আর সঞ্জয়ও যাবে।

– তুই কি কণিকা কে বলবি যেতে?

– আগে আমাদের টা ঠিক হোক, দেখব পরে না হয়।

কণিকা আমার কলেজের গাল্রফ্রেন্ড, এখন সে সৈকত কে বিয়ে করেছে, সেসব কথা পড়ে হবে এখন। খুড়ো, সঞ্জয় এরা সব আমাদের বন্ধু, কল্যাণী থেকেই, ওখানে আমরা কলেজে পড়তাম একসাথে, এক ই মেসে থাকতাম, আমাদের সাথে অরিত্রও থাকত, সে যাবেনা।

– তথাগত বা অরূপ করণ যাবে?

– অরূপ তো ভেগেছে, শেষ মাসের মেস ভাড়া না দিয়ে।

– সেকি? তোরা ছিলিনা?

– আমরা গাঞ্জা খেয়ে পরেছিলাম।

– ওখানে গাঞ্জা পেলি কোথায়?

– এক রিক্সাওয়ালা র সাথে গেছিলাম, রাত তিনটে নাগাদ, বেশ ভাল মণিপুরী গাঞ্জা, রিক্সাওয়ালাকেও দিলাম, আমরাও খেলাম, মালটা ভাড়া নেয়নি আমাদের থেকে।

– খাসাতো, আমি বাড়ীতে বোর হচ্ছি, তথা কি জিগ্যাসা করিস।

– ঠিক হ্যায় বেটা, এখন একটু ঘুম দি, অনেক ভেবেছি, বাড়ীতেও জানাতে হবে।

– বাড়ীতে জানাসনি?

– না, তবে বাবা না করবেনা।

– ঠিক আছে, কাল চলে আয় তাহলে টিকিট কাটতে যেতে হবে।

– হু।

তথাগত যাবেনা, ও কলকাতা থেকে বাইরে গেলে সোজা নাকি, বিদেশেই যাবে। বড়লোকের ছেলে, ওর মুখে ওইসব কথা মানায়। আমার আনন্দও হচ্ছে বেশ, আবার বহুদিন পরে আমি, সৈকত, খুড়ো, সঞ্জয় সব একসাথে থাকব। ব্যাঙ্গালোরে সুফল আর প্রবীন আছে, সিঙ্ঘানিয়াও আছে, ওদের সাথে যোগাযোগ করে ঘড় ঠিক করা যাবে, টিকিট হয়ে গেছে, দেরি আছে, পুজোর পরে তো, একটু ল্যাদ খাই কদিন।

সিঙ্ঘানিয়ারা বাঙ্গালী নয়, তবে ওরা কল্যাণীর ই লোক, ওখানেই জন্মানো, বড় হওয়া, একটা একান্নবর্তী পরিবার ওদের, বেশ ভালো। আমাদের বন্ধু বলদ একবার ফোন করেছিল ওদের বাড়ী, রাত একটায়, পরীক্ষার আগে আগে, কিছু একটা বুঝতে পারছেনা, সিঙ্ঘানিয়ার হেল্প দরকার। ওদের একটাই লাইন ছিল, সব ঘড়ে প্যারালাল লাইন। রাত এক্টায় সবাই ঘুমিয়ে, শুধু সিঙ্ঘানিয়ার এক জেরতুত দাদার বিয়ে হয়েছে, সে শোবার ঘরে জেগেছিল, সেই ফোন তুল্ল,

– কাকু সিঙ্ঘানিয়া আছে?

– এই বাড়ীতে ২০ টা সিঙ্ঘানিয়া থাকে, শুওড়ের বাচ্চা, তোর কাকে চাই?

টাক, বলদ ফোনটা কেটে দিয়েছিল। বাঙ্গালী না হোলেও, কথাবার্তায় পুরদস্তুর বাঙ্গালীয়ানা, কোন মা, বোনের হিন্দী গালী দেয়নি ওর দাদা।

আমি এখনো সিঙ্ঘানিয়ার নামটা মনে করতে পারছি না।

সবকিছু ঠিকঠাক, এখন কণিকা কে জানানো হয়নি, কাল যাবো ওর সাথে দেখা করতে, ফোনে বলব না। কিযে বলব কে জানে, গাল দেবে না দেবেনা? কাল দেখা যাবে, আজ ল্যাদ খাই।

 

You can follow me on Twitter, add me to your circle on Google+ or like our Facebook page to keep yourself updated on all the latest from Photography, Technology, Microsoft, Google, Apple and the web.

Advertisements

One Comment Add yours

  1. azad says:

    avinaba da …habby likhechooo

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s