মেসে ৭৪ প্রথম ভাগ (মধ্যবিত্তের ডায়েরী – ২)

মেস বাড়ী হল বাঙ্গালী ছাত্রজীবনের অঙ্গ। আমার যখন কল্যাণী যাওয়া ঠিক হল, প্রথমেই ঠিক করতে হয়েছিল কোন মেসে গিয়ে থাকব। আমার এক বন্ধু শুভজিতের সাথে যোগাযোগ করে B-Block এ একটা মেসে কিছুদিন থাকলাম, কিন্তু কলেজ থেকে দূরতবের জন্য, খুব শীঘ্রই আমাকে A-Block এ সরে আসতে হয়। A-Block এ বেশীরভাগ সময়ই আমি অরূপ এর সাথে মেসে কাটিয়েছিলাম, ভালো ছেলে তবে একটু হাতটান দোষ ছিল। বাকিদের জিনিষ ঝাঁপত, ঠিক ছিল, বেশ মজা পেতাম, কিন্তু আমার একটা বেশ শৌখিন পাঞ্জাবী ছিল, মালটা সেটাও ঝেঁপে দিল? কিছু বলিনি কোনদিন, মজাই পেতাম। আর ওর অনেক ঝাঁপাতে আমিও সাহায্য করেছি। মনে আছে পাপড়ির সাথে বাজী ধরে কলেজ থেকে UPS ঝাঁপা, ওটা ছিল একদম চলতি ভাষায় হেব্বি

যাইহোক এ-মেস, সে-মেস করে বেরিয়েছি চার বছর বেশ করে, তবে সবথেকে মজা করেছি আর বেশীদিন থেকেছি রাকেশদার মেসে। মেসে আগে থাকত সৈকত, অরিত্র, খুড়ো আর সঞ্জয়। মেসের একটা নিয়ম ছিল যে সবার একটা করে ডাকনাম থাকবে, সৈকতের নাম ছিল ভোম্বল, ও বেশীরভাগ সময় ভোম মেরে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতো তো তাই। অরিত্র প্রচুর কালো ছিল, তো ওর নাম ছিল KP, ভাল বাংলায় কালো পোদ, সঞ্জয় বৌদি, আর খুড়ো তো খুড়োই। আমি যখন ঢুকলাম, আমার নামকরন হল ঘাই, আমার একটা সুভাষ ঘাই এর মত টুপি ছিল তাই।

তবে রাকেশদার মেসে থাকার আগে বেশ কিছুদিন ছিলাম জিসন দার মেসে, ওই মেসটা ছিল আমাদের পূর্বরাগ মেস। আমি, অরূপ তো থাকতামই, সাথে থাকত প্রীতম, বেদান্ত আর মুস্তাফা। সেটা ২nd ইয়ার হবে, সবাই বেশ প্রেমে পরে গেছে আর অনেকে বলেও দিয়েছে, কিন্তু উত্তর কেউই পায়নি। রোজ কলেজ থেকে মেসে এসে আমাদের কাজ ছিল নিজের নিজের প্রেমের গপ্প করা। মুস্তাফার একটা টেপ-রেকর্ডার ছিল, সেটা তে শুনেই প্রথম সুমন কে ভালো লাগে, তখন তিনি কবীর সুমন হন্নি সম্ভবত, বা হয়ে গেলেও মনে নেই। আমাদের কাছে, কবীর সুমন চিরকালই সুমন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। আর যদি গান না শুনতাম, মুস্তফা যে ভাবে সুমনের গান গাইত ভরা গলায়, গায়ে কাঁটা দিয়ে যেত।

মুস্তাফা, প্রীতমকে একেবারেই সহ্য করতে পারত না, প্রীতমের একটু নাক উঁচু স্বভাব ছিল।

– আমি জাঙ্গিয়া পড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সব মেয়েরা ছুটে আসবে।

– হ্যাঁ, দাঁড়া গিয়ে বাইরে, কুত্তা এসে মুতে দিয়ে যাবে।

0[1]হঠাত ঠিক হল রোজ সকালে উঠে মর্নিং ওয়াক করতে যাব, আমরা যেতাম তিন চার দিন, ওই কুয়াশার মধ্যে আমরা কজন, আর আমাদের কয়েকজনের সিগারেটের ধোঁয়া, দেখা জাচ্ছে না। আর ওই রাস্তায় অন্য কাউকে আমরা ঠিক সহ্য করতে পারতাম না। একদিন সকালে এক ভদ্রলোক তার কুকুর কে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন, মুস্তাফার প্রশ্ন, “কাকু কুত্তা টা কি বিদেশী?”, সেই ভদ্রলোকের ভয়াবহ চাহনী আমাদের দিকে, জীবনেও ভুলব না। পরে আর কোনদিন ওই ভদ্রলোক কে ওই রাস্তায় দেখিনি।

জিসন দা রা খেতে ভালবাসত, লিচু, বীয়ার, স্ট্রবেরী সব ফ্রীজে তালা দিয়ে রাখত আমরা যাতে না খাই। ফ্রিজটা পুরানো ছিল বলে দরজার উপরে একটু চাপ দিলেই খুলে যেত, ওখানেই আমার প্রথম স্ট্রবেরী খাওয়া। আর সেই লিচু খেয়ে বিচি জানলা দিয়ে ফেলতাম, সকাল বেলা জিসন দা পরিস্কার করত, মজা লাগত। বাজে কাজও যে কিছু হয়নি তা নয়, একবার মুস্তাফা জলের মধ্যে পেচ্ছাপ করে সেটা, কলেজ থেকে এলে পড়ে প্রীতম কে খেতে দিয়েছিল।

জিসনদার দুটো বউ ছিলো, একজন এখানে আর একজন বাংলাদেশে। জিসনদার বৌ এখানে স্কুলে পড়াত, আর জিসনদা ঘরের কাজ কম্ম করত। সেই নিয়েও আমরা কম খ্যাপাতাম না লোকটাকে। জিসনদা আমাদেরই এক বন্ধুর বাড়ী ভাড়া নিয়ে মেস করেছিল, কাবেরীদের বাড়ী, কাবেরী আর কাকিমাকেও প্রচুর জ্বালিয়েছি। কাবেরির সাইকেলটাতো প্রীতম নিজেরি সম্পত্তি করে নিয়েছিল, আর আমাদের মেসে একবার চোর আসলো, সাইকেল নিয়ে পালাল, শুধু বেদান্তর সাইকেল পরেছিল, চেন দিয়ে আটকান ছিল তাই, এবার প্রীতম কি করবে, টাকা পয়সা নেই, প্রীতম কাবেরীর সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল, কাবেরী কে দেখলে, অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেত। এরি মধ্যে বেদান্ত এসে বলল, শুভ্রা হ্যাঁ করে দিয়েছে, আমি আনন্দের চোটে জিসনদার বিছানার চাদর ছিঁড়ে দিলাম, পয়সা চায়নি জিসনদা, লোক ভালো ছিল।

সারাবছর এইসবই করতাম, কিচ্ছু পড়াশুনা তো কোরতাম না, সেমিস্টারের আগে রাত জেগে পড়া, আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে রিভাইস দেয়া, জীবনেও ভুলবনা। ২nd সেমিস্টারের ফিসিক্স পরীক্ষার আগের দিন স্বপ্নে এলেন আইন্সটাইন আর সত্যেন বোস, এসে বেশ আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন। হুট করে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল, বেদান্ত কে ডাকলাম, “উঠে পড়, কালকের ফিসিক্স এর প্রশ্ন সব আমায় সত্যেন বোস আর আইন্সটাইন এসে বলে গেল।” দুজনে উঠে বসলাম পড়তে, সেই গুলো ভুলেযাবার আগে। ভাগ্যক্রমে ১০০% কমন এসছিল, নইলে বেদান্ত আমার ছাল ছাড়িয়ে নিত।

দুই বছর এইসব করে তারপর উঠলাম রাকেশদার মেসে। রাকেশদার মেসে এসে তো আমার নামকরন হল, আর পরিচয় হোল নতুন বন্ধুদের সাথে, আমাদের মেসের কথা তো বললামই, রাকেশদা নিজের বাড়িতেও ছেলে রাখত। রাজীব, সুফল, কীর্তন, চানু ওখানে থাকতো। এদের মধ্যে রাজীব ছিল বেশ বলিয়ে করিয়ে ছেলে। সর্বদা মেয়েদের নিয়ে ঘুরত বলে ওর নাম ছিল DMB বা ডায়ানামিক মাগী বাজ। সেই মেসটাও ছিল বটে মেয়েদের মেসের সামনে। সেই মেসে বানু থাকত, আমি ওর সাথেই কলেজ যেতাম, আর উপর থেকে কীর্তন আর নীচের থেকে রজীবের টিটকিরি শুন্তে পেতুম, কিছু বলতাম না, মেয়েদের সঙ্গে আছি না তখন, আমি না ভদ্র ছেলে?

স্নিগ্ধাদের সাথে এর মধ্যে পরিচয় হল, প্রথমদিন দেখা হয়েই আমার ঘাড় ভেঙ্গে সিঙ্গারা আর কচুরি খেয়ে, মনে মনে হেব্বি খিস্তি করেছিলাম, কিন্তু মুখে কিছু বলিনি, ঐযে, মেয়েদের সঙ্গে আছি না তখন, আমি না ভদ্র ছেলে? রাকেশদার মেসে এসে, নামকরন ব্যাপারটাই সবথেকে মজাদার হত, রাকেশদার নাম ছিল রাকু, রাকেশদার দাদার নাম বকু আর বাবার নাম ডাকু। এই ডকুর সঙ্গে পরিচয় বেশকিছুদিন আগে অবশ্য, বকুর ছেলের মুখেভাত, আমি আর অরূপ করণ কি বেশ একটা কাজে রাকেশদা দের বাড়ী গেছি, ডাকু কে ডেকে অরূপ এর প্রশ্ন,

– জেঠু বাড়ীতে প্যান্ডেল, কারোর শ্রাদ্ধ নাকি?

– তোমার বাপের শ্রাদ্ধ হারামজাদা।

ইতিমধ্যে আমাদের নামকরনেরো অনেক বছর হয়ে গেলো, বোর লাগছিল, মনে মনে, কার কি নতুন নাম দেয়া হবে খুজছিলাম সবাই মিলে, কিছু দেয়া হচ্ছিল, কিন্তু বেশীদিন টিকছিল না, এমন সময় আমাদের মেসে কে একটা বেশ সাড়ে চুয়াত্তরের সিডি নিয়ে এল। হই হই রই রই কান্ড, আমার এ যৌবন গানে, খুড়োর সে কি নাচ, সেটাও ল্যাংটো হয়ে, আহা যৌবন প্রদর্শন করাতে হবে তো নাকি? সারে চুয়াত্তর দেখার পরে আমাদের নামকরন ও পালটে গেল, মূল নামের থেকে ক্ষণস্থায়ী হলেও বেশ কিছুদিন চলেছিল।

কে কি নতুন নাম পেল? সেসব পরের দিন বলব নাহয়, একটু ধৈর্য ধরুন।

 

You can follow me on Twitter, add me to your circle on Google+ or like our Facebook page to keep yourself updated on all the latest from Photography, Technology, Microsoft, Google, Apple and the web.

 

Advertisements

2 Comments Add yours

  1. Sankha says:

    বেশ ভালো হ্য়ছে রে Abhinabha. অনেক পুরনো কথা মনে পরে গেল। যদিও আমি বেসিরভাগ সময়েই বাড়ি থেকে যাতায়াত করতাম তাও যে কদিন মেসে বা hostel -এ ছিলাম খুব enjoy করেছি। মনে আছে এই রাকেশদার মেসেই 2nd year fest -র দিন রাতে আমার প্রথম মদ খাওয়া। kp host ছিল মনে হয়।
    লিখতে শুরু করেছিস যখন তখন আমাদের fest নিয়ে কিছু লেখ। প্রচুর experience আছে।

  2. Kamal Paul says:

    Amar ekta jinis kicchutei mathai asche na… tor panjabi arup er gaye hoachilo??

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s