পলাতকা

– ছোটবেলা থেকেই তো পালাতাম স্যার, নতুন কি? দেশ থেকে পালিয়েছি, ভাষা ভুলতে চেয়েছি, মানুষের প্রশ্ন, দৃষ্টি সবথেকে তো পালাতেই চেয়েছি।

– সব ছিল আমাদের জানেন স্যার, বাড়ী ছিল, জমি ছিল, গরু ছিল, আমি দুধ দোয়াতে ভালবাসতাম ছোটবেলা থেকে, আমার পিসিদের কথা এখন মনেপড়ে, পিসির ছেলেমেয়েরা, আমি, ভাইয়েরা সবাইমিলে শ্যালোর জলে চান করতাম, সে অন্যদিন ছিল। বাবি, রূবেল, পাবলো, বুবুন, কোথায় তারা কে জানে! ওইসব ছেড়ে আসতে ইচ্ছে ছিলনা স্যার, তখন আমার কতই বা বয়স কি বা বুঝি, বাবা একে একে আমাকে আর আমার পরেও পাঁচ ভাইকে এদিকে পাঠিয়ে দিলেন, এক কাকুর বাড়ী, কুপার্স ক্যাম্প, রাণাঘাট, কিভাবে এলাম কিছুই মনে নেই, ওই কাকুই সব করে দিয়েছিলেন ব্যবস্থা। আমাদেরতো তখন সব শেষ স্যার, এ ছাড়া উপায় ছিলনা কিছু।

– মইনুল আমাদের বাড়ী আসত, সকালে দুধ নিতে। একদিন এসে বলে গেল বাবাকে, রাত্রে নাকি আমাদের বাড়ী ওরা আগুন দেবে। আমরা ভাইবোনেরা তো কিছুই বুজছিলামনা, মা কাদছিল খুব আর বাবার সাথে জিনিষপত্র গুছচ্ছিল, আমি আবার বড়তো, বাবকে জিগ্যাসা করতে গিয়ে এক চড় খেলাম, ভাইয়েদের কি হাঁসি, ওরা বেশ মজাই পাচ্ছিল, কোথাও ঘুরতে যাব তো আমরা।

– খোলপটুয়া নদী পেরিয়ে পিসির বাড়ী, নৌকায় যখন চড়লাম তখন সন্ধ্যা, নৌকায় বসে বসে দেখলাম, আমাদের বাড়ী দাউদাউ করে জ্বলছে, মা হাউ হাউ করে কাঁদছে, মায়ের চোখে আগুনের ছবি দেখছিলাম, সিনেমার মত। আমাদের বইপত্র সব ফেলে এসছিলাম, গোরু জমি কিছুই রইলনা, পিসির বাড়ী উঠলাম, পরে কবে যে বাব কি জোগাড়যন্ত্র করে আমাদের নিয়ে এল অত মনে নেই, ছিলাম খুলনা, এলাম রাণাঘাট।

– ৯২ সাল স্যার, আপনাদের এখানে বাবরী মসজিদ ভাঙল, আমাদের ওখানে মাসুল গুনতে হল। হ্যাঁ স্যার এখন আমাদের কাছে ওইদিকটাই আমাদের, এদিকটা আপনাদের, রেশন কার্ড হয়ে হয়ে যাবার পরেও। সেই যে পালান শুরু হল স্যার, তারপর থেকেই পালাচ্ছি, এখন পালাছি।

– কথাইতো বলেতে পারতামনা আপনাদের মত করে, সেটা ঠিক করতে কম ঝক্কি পোহাতে হয়েছে? তাও এখন মাঝে মাঝে “বাতাস”, “বাসা” এইসব বেরিয়ে যায়, ক্লায়েন্টরা হাসাহাসি করে, তবে আমাদের পাড়ার মেয়েরা বেশীরভাগই বাঙ্গাল, ভালোই আছি বাইরে থাকার থেকে।

– ইংরেজীও শিখেছি কিছু কিছু, আজকাল আর কেউ বাবু বলেনা খদ্দেরদের, ক্লায়েন্ট বলে, এখানে এসে তো পড়াশুনা করতে পারিনি, পাঁচ ভাই আমার পরে, বাবার কোন কাজকম্ম ছিলনা, মা অন্যের বাড়ী রান্না করত, ভাইয়েদের পরাতে হবেত। আমার পরেরটা পড়াশুনোয় ভালোছিল, এখানে এসে আর মন লাগলনা, বখে গেল, বিড়ি খাওয়া শুরু, এখন বেচে আছেকিনা কে জানে, আমি মার সাথে যেতাম বাসন মাজতে। পাড়ার নান্টুদা ভাইয়ের দোস্ত ছিল, সে বাবাকে টাকাদিয়ে আমাকে নিয়েগেল, বালিগঞ্জের এক ফ্ল্যাটে কাজ করতাম, দেখতে শুনতে ভালছিলাম, ওই বৌদি আমায় নামাল এই ব্যবসায়। মজার ফ্যামিলি জানেন স্যার, বৌদিও এই কাজ করে, দাদা জানে, কোন প্রবলেম নেই তাতে।

– এইযে আজ আপনারা হোটেল থেকে তুলে আনলেন স্যার, আমার সাথে যে ছিল, তাকে তো আনলেন না, বেশ করেছেন, ওদের তো পরিচয় আছে, আমার নেই, বাবা মা আছে কি গেছে কে জানে।

– এখন আর পালাইনা জানেন স্যার, এখন বেশ নামডাক আছে আমার তো, সকালে দেখবেন দাদা এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন।

সূর্য উঠছে, থানার জানলা দিয়ে হাল্কা আলো এসে পড়ছে ভিতরে, মৃন্ময় হাতঘড়ি দেখলেন, তিনি জানেন কেঊ না আসলেও ঝিমলিকে ছেড়ে দিতেই হবে, লকআপ ফাঁকা নেই।

You can follow me on Twitter, add me to your circle on Google+ or like our Facebook page to keep yourself updated on all the latest from Photography, Technology, Microsoft, Google, Apple and the web.

Advertisements

One Comment Add yours

  1. PaglaJogai says:

    ভালই হচ্ছে লিখে যান। Partition যে এদেশীয়দের জন্যও বিপর্যয় বয়ে এনেছে সেটাও সবাইকে বোঝানো দরকার। বাঙালি হিন্দুকে এর মোকাবিলা ঐক্যবদ্ধভাবে করতে হবে, না হলে ধ্বংস এড়ানো যাবে না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s